চলমান অস্হিরতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় আমাদের প্রস্তুত
বাংলাদেশে ছাত্রদের সরকারী চাকুরীতে বৈষম্যবিরোধী কোটা আন্দোলন- ২০২৪, দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা অর্জন-২০২৪ এবং তৎপরবর্তী সামাজিক পরিস্হিতি, এই প্রক্রিয়াগুলো সাম্প্রতিক সময়ে নারী, পুরুষ, ধর্ম, বর্ণ, বয়স, পেশা, সমাজিক অবস্হান নির্বিশেষে সারাদেশের মানুষের মনে উদ্বেগ, উৎকন্ঠা, আতন্ক তৈরী করেছে এবং করছে। মানুষ ঘুমাতে পারছেনা, খেতে পারছেনা, কাজে মনোযোগ দিতে পারছেনা। ঘরে এবং বাইরে, কর্মস্হলে কোথাও জীবনের নিরাপত্তা নেই।সকল পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। জনজীবনে নেমে এসেছে অর্থনৈতিক ধ্বস।চোখের সামনে মানুষ দেখেছে তাজা প্রাণগুলো ঝরে যেতে। দেখেছে মানুষের জিঘাংসা। যারা রাজনীতি করেন এবং যারা করেন না, সকল মানুষের মনে রাষ্ট্রের অদূর ভবিষ্যত নিয়ে প্রতি মূহুর্তে চলছে নানা ধরনের অজানা আশংকা, কি ঘটতে যাচ্ছে দেশের, ইত্যাদি। স্বাধীনতার আনন্দে মানুষ উদ্বেলিত হয়েছে কিন্ত এখনও জনজীবনে নেমে আসেনি স্বস্তি। উদ্বেগ, হতাশা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।সাথে রয়েছে স্বজন হারানোর শোক।
এবাবে যখন সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্হিরতা নাগরিক অস্থিরতায় পরিণত হয়, তখন এর প্রভাব ধ্বংসাত্মক হতে পারে। এটি মানুষের শরীর এবং মন উভয়ের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, এমনকি যদি কেউ সংঘর্ষের আশেপাশের ঘটনাগুলির সাথে সরাসরি জড়িত নাও হন।
মানসিক স্বাস্হ্যে এর প্রভাব:
রাজনৈতিক বা সামাজিক অস্থিরতার মতো উচ্চ-চাপের ঘটনাগুলির প্রত্যক্ষ করার পরে
মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তা বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে, যার মধ্যে রয়েছে অনুরূপ ঘটনাগুলির সাথে ব্যক্তির পূর্বের অভিজ্ঞতা, ঘটনা বা দুর্ঘটনার আগে শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক সমর্থন এবং চাপ মোকাবেলার কৌশল, ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে যেসব লক্ষন সাধারণত দেখা যায় সেগুলো হল:
• শক—এমন অনুভূতি যে ঘটনাটি “অবাস্তব”
• ভয় এবং উদ্বেগ—নিজের, সহকর্মীদের এবং প্রিয়জনদের নিরাপত্তা নিয়ে
• দুঃস্বপ্ন—সম্ভাব্য দৃশ্য বা ফ্ল্যাশব্যাক সম্পর্কে যা ঘটানার সময় দেখা হয়েছে
• খেতে বা ঘুমাতে সমস্যা
• মনোনিবেশ করতে, পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে বা সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা
• ভুলে যাওয়া
• রাগান্বিত হওয়া
• অতি-সক্রিয়তা বা অলসতা
• নেতিবাচকতা
• মানসিক অবসাদ
• পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও চরম ক্লান্তি
• শারীরিক প্রতিক্রিয়া—যেমন পেটে ব্যথা, মাথাব্যথা, ঝাঁকুনি, বা পেশীতে টান, ইত্যাদি।
.বিভিন্ন প্রকার মানসিক রোগ দেখা দেওয়া বা পূর্বের মানসিক রোগ প্রকট হওয়া
উত্তরণের উপায়:
১) প্রথমত এসবের মানসিক প্রভাব সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে।মানসিক চাপের কিছু সাধারণ প্রতিক্রিয়া রয়েছে যা মানুষ অস্থির সময়ে অনুভব করতে পারেন।
যেহেতু আমাদের মস্তিষ্ক উচ্চ-চাপের ঘটনা বোঝার চেষ্টা করছে, তাই আমরা যদি আমাদের অনুভূতি অস্বীকার করার চেষ্টা করি বা প্রতিক্রিয়াগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করার চেষ্টা করি তবে এটি আমাদের পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াটিকে ধীর করে দিতে পারে।
তাই, আমরা আমাদের এই অনুভূতিগুলিকে যদি মন থেকে গ্রহণ করতে পারি তাহলে এটি আমাদের মন নিরাময়ে সহায়ক হবে।
২)যদি মানসিক বা শারীরিক প্রতিক্রিয়া আমাদের অনেক সপ্তাহ ধরে দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপ এবং আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক, সামাজিক এবং পেশাগত জীবনকে বাধাগ্রস্থ করে, তাহলে আমরা মানসিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারি।
৩)তাছাড়া, মানসিক চাপ বা আঘাত পরবর্তী বিভিন্ন ধরণের মানসিক রোগ প্রতিরোধ করতে আমরা কিছু কৌশল অবলম্বন করতে পারি।যেমন;
★যখন ফ্ল্যাশব্যাক বা স্বপ্ন দেখা দেয়, সেটিকে যদি মানসিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের একটি স্বাভাবিক অংশ ; যা সাধারণত সময়ের সাথে সাথে হ্রাস পায়,- এভাবে উপলব্ধি করা যায়, তাহলে এটি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
★এভাবে যদি আমরা আমাদের প্রতিক্রিয়াগুলি গ্রহণ করতে সক্ষম হই এবং তাদের সাথে লড়াই না করি তবে তারা সাধারণত দ্রুত চলে যায়।
★আমাদের জানতে হবে, বেশিরভাগ লোক যারা একটি আঘাতমূলক ঘটনা অনুভব করেন তাদের পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার হয় না। তাই চাপ মোকাবেলা করার জন্য অ্যালকোহল বা ড্রাগ ব্যবহার করা এড়িয়ে চলুন।
★পর্যাপ্ত ঘুমের জন্য নিয়ম কানুন মেনে চলুন।
★নিয়মিত মেডিটেশন, রিলাক্সেশন চর্চা, শারীরিক ব্যায়াম, খেলাধূলা ও অন্যান্য বিনোদনমুলক কাজে অংশগ্রহণ করুন।
★দূর্ঘটনাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ান।ভয়কে জয় করুন।
★আত্মহত্যা, হত্যার মত চিন্তা মাথায় আসলে তাৎক্ষণিক মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। প্রয়োজনে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিন।