ক্রান্তিকালের ক্লান্তি সারাতে
জীবনচলার পথে প্রতিটি মানুষের জীবনে আসে কিছু পরিবর্তন,কিছু রূপান্তর। যার মাঝে কিছু ঘটনা থাকে আমাদের প্রত্যাশিত,কিছু অপ্রত্যাশিত,কিছু ইতিবাচক,কিছু নেতিবাচক। যেমন:বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া,উচ্চশিক্ষালাভ করা, লটারী জেতা,সন্তান জন্মদান,চাকুরী প্রাপ্তি,পদোন্নতি ইত্যাদি ইতিবাচক ঘটনা।
পক্ষান্তরে, যে কোনোপ্রকার সম্পর্কচ্ছ্দে,আপনজনের মৃত্যু,চাকুরীচ্যুতি দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হওয়া,দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি হওয়া ইত্যাদি নেতিবাচক ঘটনা; যা কারোই কাম্য নয়। আবার কিছু পরিবর্তন আছে,যা ধাপে ধাপে হয়,যা অবধারিত। যেমন; শৈশব থেকে কৈশোর,তারপর যৌবন,তারপর প্রৌঢ়তা এবং সবশেষে বৃদ্ধকাল, এই প্রতিটি ধাপের নির্দিষ্ট কিছু চাহিদা রয়েছে,রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু কাজ। এই ধাপগুলোর একটি থেকে আরেকটিতে পদার্পনকালে আমরা নতুন কিছু পরিস্হিতি, নতুন কিছু সমস্যার সম্মুখীন হই। আবার, বয়োবৃদ্ধি বা পূর্ণতাপ্রাপ্তির এক পর্যায়ে আমাদের সৌন্দর্য্য,কর্মক্ষমতা,বুদ্ধিবৃত্তি লোপ পেতে থাকে। জীবনের অন্তিমকালে তৈরী হয় চাওয়া-পাওয়ার দ্বন্দ।জীবনে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। এভাবে, জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি প্রতি মূহুর্তেই, জীবন তার বাঁক বদলায়। আমাদের জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে, জীবনকে সমৃদ্ধ করতে এই ধাপগুলোর পরিবর্তনকে মোকাবিলা করেই এগুতে হয়। যারা এসব পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে, নিজেকে সহজেই খাপ খাওয়াতে দক্ষতা রাখেন তারাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হন,সফলতাকে আলিঙ্গন করতে পারেন,অর্জন করেন আত্মতৃপ্তি।
কিছু মানুষ আছেন যারা পরিবর্তনকেই ভয় পান।গৎবাধা জীবন আর নির্দিষ্ট গন্ডীর বাইরে যেতে চান না।পূর্বের যাপিত খারাপ জীবনের চাইতে তাদেরকে যদি সুখ-স্বাচ্ছন্দে ভরা নতুন জীবনও হাতছানি দেয় তাতে তারা উপযুক্ত সাড়া দিতে ভয় পান, আশংকায় থাকেন কি জানি কি হয়। কারণ তারা আলোকবিহীন জীবনযাপনেই হয়ে পড়েন অভ্যস্ত। সেখান থেকে জোরপূর্বক বের করতে গেলে তাদের মনে তৈরী হয় উদ্বেগ আর অস্বস্তি।
পরিবর্তনের সুযোগ সবসময়ই থাকে।কিন্তু যাদের মাঝে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি থাকে তারা নতুনকে জয় করার ঝুঁকি নিতে গেলে ভেতর থেকে একধরনের বাঁধা অনুভব করেন। ভাবেন,পাছে কি জানি কি হয়।
আর এ ভীতি শুধু নেতিবাচক বিষয়ে হয় তা কিন্তু নয়। ইতিবাচক পরিবর্তনেও কারও কারও মাঝে ভীতি কাজ করতে পারে। তাদের মনের গহীনে থাকা কিছু নেতিবাচক চিন্তা,কিছু আবেগ, কিছু নেতিবাচক অভিজ্ঞতা এতে জোড়ালো ভুমিকা রাখে। তারা হয়তো ভাবেন, আমি পারবতো এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে ? আমি সফল হতে পারবতো ? এটা করলে লোকে কি ভাববে ?আমার কি কাজটি করার মতো যথেষ্ট দক্ষতা রয়েছে ?…ইত্যাদি।আর এভাবেই তারা জীবনের গুণগত মান বৃদ্ধির সুযোগ সুবিধা থেকে হন বঞ্চিত।
তাই আসুন জেনে নেই জীবনের ক্রান্তিকালগুলোকে কিভাবে মোকাবিলা করা যায় তার সহজ কিছু পদ্ধতি,কিছু পরামর্শ :
১। যখনই আমাদের জীবনে হঠাৎ করে নেতিবাচক কোনো পরিবর্তন আসে আমরা কি করি? আমরা হয়তো খুব আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি,ভেঙ্গে পড়ি,অন্যের সহানুভূতি পেতে চাই,স্বান্তনা খুঁজি।পরিবর্তনটাকে ঠেকাতে অজুহাত খুঁজি ।কখনও কখনও ভয় পেয়ে নতুন পরিস্হিতিকে এড়িয়ে চলি। প্রকৃতপক্ষে,আমাদের যা করতে হবে তা হলো এই পরিবর্তনগুলোকে স্বীকৃতি দিতে হবে,মেনে নিতে হবে।পরিবর্তিত পরিস্হিতিতে নিজেকে তৈরী করতে হবে প্রতিকুলতা মোকাবিলা করার জন্য,নিজের দায়-দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।অন্যের আশায় না থেকে
নিজের মাঝে সাহস সঞ্চার করে এগিয়ে যেতে হবে।আমাদের জানতে হবে এই পরিবর্তন গুলোকে ভয় পেয়ে এড়িয়ে গেলে চলবেনা।পরিবর্তনগুলোকে দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করতে হবে, ভয়কে জয় করতে হবে।কারণ,ভয়-ভীতির অনুভুতিগুলি আমাদের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া যা প্রতিকুল পরিবেশে আমাদের সচেতন করে নিজেদের রক্ষার্থে।
২। আমরা সাধারণত অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা করতে,অন্যকে অনুকরণ করতে পছন্দ করি-যা কাম্য নয়।অন্যের জীবনে ঘটেছে এমন বিষয় থেকে আমাদের শুধু দীক্ষা নেয়া উচিত,তাদের অনুসরণ করা উচিত, কিন্তু কখনোই কাউকে অনুকরণ করা উচিত নয়।নিজের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হবে; নিজেকে সহায়তা করার জন্য,অন্যের সাথে তুলনা করে কষ্ট পাওয়ার জন্য নয়।বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে নিজের অবস্হানে থেকে কাজ করে যেতে হবে।প্রত্যেকেরই কাজের নিজস্ব লক্ষ্য ওউদ্দেশ্য থাকে এবং কাজ করার পদ্ধতি, সামর্থ্য ও সংগ্রাম করার ধরণ ভিন্ন। তাই অন্যে পারল আমি কেন পারলামনা ইত্যাদি ভেবে নিজেকে দোষারূপ করা কখনোই সমীচিন নয়।
৩। আমাদের মাঝে কেউ হয়তো চাকুরীচ্যুত হয়েছেন,কেউ বিবাহবিচ্ছেদে গিয়েছেন অথবা কেউ দূরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। তখন এসব ভেবে বসে থাকলে চলবেনা যে,আমিতো বেকার ..পৃথিবীকে আমার কি দেয়ার আছে?আমি ডিভোর্সী…সমাজে আমার কোনো অবস্হান নেই বা আমার ক্যান্সার হয়েছে,বাচাঁর আর আশা নেই।যার চাকুরী চলে গেছে তিনি আরও ভাল কিছু করার চেষ্টা করতে পারেন, যিনি ডিভোর্সী তিনি জীবনকে নতুন আঙ্গিকে সাজাতে পারেন আর যিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত যিনি বেচেঁ থাকার সর্বোচ্চ লড়াইটুকু অন্তত করতে পারেন। সবসময়ই কিছু না কিছু করার থাকে। অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলোকে মেনে নেয়া মানে এই নয় যে, কাউকে সেই অবস্থানেই পড়ে থাকতে হবে।তাকে মনে রাখতে হবে যে তার বর্তমান অবস্হানই সবকিছু নয়,এরচেয়ে বেশী অনেক কিছুই করার আছে,এর বাইরেও তার একটা জগত আছে।প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার,ভিন্নভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ রয়েছে।
৪। সাহায্য চাওয়ার জন্যও সাহসের প্রয়োজন হয়। নিজের পরিবার,বন্ধু, বিশেষজ্ঞের কাছে আমরা পরামর্শ চাইতে পারি। আমাদেরকে সহায়তা করার জন্য চারপাশে অনেক সহৃদয় ব্যক্তি থাকেন, যারা বিভিন্নভাবে আমাদের সহায়তা করতে প্রস্তুত থাকেন..যা অবাক করে দেবার মতো।
৫। আমরা যদি নিজেকে বোঝার চেষ্টা করি,নিজের সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখি, জানার চেষ্টা করি কি আমাদের প্রয়োজন,আর সে অনুযায়ী কাজ করে যাই তাহলে আমাদের প্রবল ইচ্ছাশক্তি এবং কাজের দক্ষতাই আমাদিগকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছাঁতে সাহায্য করবে।
৬।যা এখনও ঘটেনি কিন্তু আমাদের কেউ হয়তো ভাবছেন,নেতিবাচক কিছু ঘটতে পারে…এমন কোনো চিন্তায় কখনোই কষ্ট পাওয়া উচিত নয়। কারণ,প্রকৃতপক্ষে তা কখনো নাও ঘটতে পারে।অযথা কাল্পনিক চিন্তা-ভাবনায় শক্তি ও সময় ব্যয় করাই সঙ্গত।
৭। কখনও কখনও আমরা দ্বিধা-দ্বন্দে ভুগি,আমাদের কি করণীয় সে ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারণা থাকেনা। কখনও কখনও ভেবে ভেবে অস্হির হয়ে পড়ি,আবার কখনও নির্বিকার থাকি। সারাক্খণ চিন্তার জগতে মগ্ন থেকে সবকিছু বোঝার চেষ্টা করি,চারিপাশটা পর্যবেক্ষণ করি। প্রকৃতপক্ষে আমাদের মনে রাখতে হবে ক্ষণস্হায়ী এ পৃথিবীতে আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, আমাদের সময়ও খুব সীমিত। তাই কখনও কখনও বাধাকে উপেক্ষা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।সফল হওয়ার চিন্তায় মগ্ন না থেকে কাজ করে যেতে হবে।
৮। মেডিটেশন বা ধ্যান করুন। মনকে শান্ত করার,শান্তি খুঁজে পাওয়ার,মনোনিবেশ করার এবং নিজেকে ও চারপাশের জগৎকে বোঝার জন্য এটি অন্যতম মাধ্যম।বিভিন্ন জনের উপর বিভিন্ন পদ্ধতির মেডিটেশন কার্যকর হয়। তাই নিজের উপর কার্যকরী সর্বোত্তম মেডিটেশন পদ্ধতিটি আমাদের খুজেঁ বের করতে হবে এবং প্রাত্যহিক জীবনে অনর্ভুক্ত করতে হবে।
৯। যে কোনো পরিস্হিতিতে নিজেকে ভালবাসতে হবে।জীবনে যে পরিবর্তনই আসুক না কেন কথায়,কাজে,চিন্তায় নিজেকে ভালবাসতে শিখতে হবে।প্রতিদিনকার নিজের জন্য কাজগুলো যেমন গোসল করা,ব্রেকফাস্ট করা ইত্যাদি শুধু অভ্যাসের ধারাবাহিকতায় না করে যত্নশীল হয়ে করা উচিত। নিজের কাজগুলোকে ভালবাসার মধ্য দিয়েই নিজের প্রতি ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।আর যতনে রতন মিলে।
১০। প্রতিদিন অন্তত একবার জোরে হাসুন;একা অথবা বন্ধুদের সাথে।মনের ভেতর থেকে হাসার তাগিদ অনুভব না করলে ও হাসির ভান করুন। দুটোই শরীর ও মনের জন্য সমান কার্যকরী। হাসলে শরীর ও মন প্রশান্ত হয়,মন দ্রুত সতেজ হয়,শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
১১। নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করুন। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ৩০-৪৫ মিনিট হাঁটা/সাঁতার কাটা /ইয়োগা প্র্যাকটিস /মার্শাল আর্টস /খেলাধুলা/নাচ ইত্যাদির মাঝে নির্দিষ্ট যে কোন একটি ব্যায়াম করুন। খুঁজে বের করুন আপনি কোনটিতে স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করছেন,কোনটি আপনার শরীর এবং মনের জন্য কার্যকর ভুমিকা রাখে।
১২। নিয়মিত, পুষ্টিকর,সুষম খাবার খাওয়া উচিত। জান্কফুড পরিহার করা উচিত।
১৩। জীবনে যখন কোন কঠিন সময় আসে তখন যদি এমন হয় যে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারছেন না তাহলে মাথা ঠান্ডা করে,একটু সচেতন হয়ে খুঁজে দেখুন আপনার কোন চিন্তা,অনুভুতি,আচরণ পরোক্ষভাবে এতে ভুমিকা রাখছে। যাচাই করুন আপনার এসব চিন্তা,অনুভুতি বা আচরণের পেছনে কোন যুক্তি,প্রমাণ বা বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য রয়েছে কিনা।নিজেকে সংশোধন করুন।প্রয়োজনে পেশাগত কারও বা বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন।
ডাঃ সাইফুন্ নাহার
এমবিবিএস, এফসিপিএস (সাইকিয়াট্রি)
বিসিএস( স্বাস্হ্য)
সহকারী অধ্যাপক(সাইকিয়াট্রি)
জাতীয় মানসিক স্বাস্হ্য ইনষ্টিটিউট ও হাসপাতাল
শেরেবাংলানগর,ঢাকা।