বাইপোলার মুড ডিসওর্ডার
সিক্ত, ২২ বছর বয়স, অনার্স ২য় বর্ষে পড়ে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চেম্বারে এসেছে তার বাবা, মা এবং আরও কয়েকজনের সঙ্গে। ইদানীং সে খুব আগ্রাসী আচরণ করছে। তাকে কোনোকিছুতে বাধা দিলে, তার কথার বিপক্ষে গেলেই সে মেজাজ দেখাচ্ছে, অন্যের গায়ে হাত তুলছে, জিনিসপত্র ভাঙচুর করছে। চিকিৎসক তার নাম, বয়স, সমস্যা জানতে চাইলে সে ঝটপট উত্তর দিচ্ছে। তার মুখে যেন কথার খই ফুটছে। বিভিন্নরকম আইডিয়া, কল্পনা-জল্পনা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, যেন মাথার ভেতর চিন্তার ট্রেন চলছে। তার শরীরি ভাষা ও কথাবার্তায় প্রকাশ পাচ্ছে হামবরা ভাব। তার মা বললেন, গত ১ মাস যাবৎ তার পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছিল না। কিন্তু ঘুম না হওয়ার কারণে তাকে খুব ক্লান্ত দেখা যায়নি কখনো। ইদানীং তার খরচ করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। মনের মাঝে যে আনন্দের জোয়ার বইছে, তা তার চোখে-মুখে প্রতিফলিত হচ্ছে। তার মাদক গ্রহণের কোনো ইতিহাস নেই। ব্রেইনের সিটি স্ক্যান রিপোর্ট স্বাভাবিক। এই প্রথম তার এমন হয়েছে। সিক্ত বাইপোলার ওয়ান ডিসঅর্ডারের ম্যানিক এপিসোডে ভুগছে।
অন্তরা, ২৫ বছর বয়স, গৃহিণী। সরকারি হাসপাতালের আউটডোরে এসেছেন তার অভিভাবককে নিয়ে। ইদানীং তার মন খুব বিষণ্ন থাকে, মুখে যেন অমাবস্যার ছায়া। কোনোকিছুই তার ভালো লাগে না। আগে ঘুরতে ভালোবাসতেন, সাজতে পছন্দ করতেন, এখন সেগুলোও ভালো লাগে না। ফ্রেশ ঘুম হচ্ছে না, খাওয়ায় অনীহা দেখা দিয়েছে। চার দিন আগে বিভিন্ন প্রকার ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। দুই বছর আগেও তার এমন হয়েছিল। চার বছর আগে তার ম্যানিক এপিসোড ছিল। আগেও হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। তিনি বাইপোলার ওয়ান ডিসঅর্ডারের ডিপ্রেসিভ এপিসোডে ভুগছেন। বারবার এমন হওয়ায় তার শ্বশুরবাড়িতে সবাই চিন্তান্বিত, তার চিকিৎসার বিষয়েও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। তারা সংসার নিয়ে অন্যকিছু ভাবছেন। তরুণদের মাঝে যাদের বাইপোলার ডিসঅর্ডার আছে এবং যারা ঝুঁকিতে আছে, তাদের প্রারম্ভিক পর্যায়ে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়ে কিছুটা সংকট তৈরি হয়। মুড সিম্পটম পর্যাপ্ত না থাকলে, অন্যান্য মানসিক রোগের সহাবস্থান, বিষণ্নতার মিশ্র লক্ষণ-এসব থাকলে সতর্ক থাকতে হবে যেন রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব বা ভুল না হয়। একপ্রান্তিক বিষণ্নতা রোগের তুলনায় দ্বিপ্রান্তিক বিষণ্নতা রোগের তীব্রতা বেশি থাকে, সঙ্গে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি থাকে, সহাবস্থানকারী মানসিক সমস্যা বেশি থাকে, কার্যকারিতার মাত্রা কম থাকে। তবে বর্তমানে বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডারের উন্নত বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি শরীরের রোগ যেমন-উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস ইত্যাদির মতো এ রোগেও দীর্ঘদিন চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়, নিয়মিত ফলোআপ করতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিলে রোগীর কার্যকারিতা ঠিক থাকে; বিয়ে, সংসার, চাকরি, সন্তান জন্মদান ও লালন-পালন সবই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
ডা. সাইফুন নাহার : সাইকিয়াট্রিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট; সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট