মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে জেলা সমিতির দায়বদ্ধতা: কিছু প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট
মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রাথমিক স্তরের চাহিদাগুলোর মাঝে রয়েছে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, নিরাপত্তা, ভালোবাসা এবং দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করা।সৃষ্টি-লগ্ন থেকেই তাই মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে । বিবর্তনের ইতিহাস দেখায় যে,গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে বসবাস এবং পারস্পরিক সহযোগিতা, বেঁচে থাকার জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান করে। সম্পদ ভাগ করে নেওয়া, একে অপরকে রক্ষা করা, কার্যকরভাবে বংশ বৃদ্ধি করা এবং একে অপরকে সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নতি লাভ করা, ইত্যাদি সামাজিক মিথস্ক্রিয়াকে একটি মৌলিক মানবিক প্রয়োজনে পরিণত করে।
মূলত,মানুষের নিজের চাহিদা পূরণ এবং পরিপূর্ণ জীবন যাপন করার জন্য অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন। বিভিন্ন গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মানুষ কেন সামাজিক সে সম্পর্কে মূল বিষয়গুলি হল:
*আদি মানুষ যারা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে বসবাস করত তাদের বেঁচে থাকার এবং বংশবৃদ্ধির সম্ভাবনা বেশি ছিল।
*শিশুদের কার্যকরভাবে লালন-পালন করার জন্য ও একটি সহায়ক সামাজিক যোগাযোগ প্রয়োজন ছিল।
*সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, জ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক অনুশীলনের সঞ্চার এবং প্রসার করতে সক্ষম করে।
*যেহেতু মানুষের কাছে আত্মীয়তা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মৌলিক চাহিদা রয়েছে, তাই সামাজিকভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে চলা মানুষের বিশেষ প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়, যা মানসিক এবং শারীরিক উভয় স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
*এটি ভালবাসা, যত্ন পেতে এবং নিজেকে মূল্যবান বোধ করতে সাহায্য করে।
*বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শক্তিশালী সামাজিক বন্ধনযুক্ত ব্যক্তিদের দীর্ঘ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সম্ভাবনা বেশি।
*সামাজিক সংযোগ একটি ইতিবাচক প্রক্রিয়া যেখানে অন্যরা বিশ্বস্ত থাকতে, উন্মুক্ত এবং উদার মন নিয়ে পারস্পরিক সহায়তায় এগিয়ে আসতে তাগিদ অনুভব করে।এতে মানুষ জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পায়।
*সামাজিক সংযোগ জীবনের সন্তুষ্টি এবং শিক্ষাগত অর্জনকে উন্নত করতে পারে।
*কর্মক্ষেত্রে কর্মদক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
*সামাজিক সংযোগ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা প্রতিরোধ করতে, ভাল মানসিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা থেকে পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে। পক্ষান্তরে, একাকীত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হতাশা, উদ্বেগ, আত্মহত্যা এবং স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকির সাথে যুক্ত। কাজেই মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা এ দুটোর মাঝে সম্পর্কের কারণে সামাজিকতার মাধ্যমে অনেক মানসিক ব্যাধি থেকে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমরা সকলেই যদিও সামাজিক, কিন্তু কেন যেন সচরাচর সামাজিকতার বড় অভাব পরিলক্ষিত হয়।অথচ
সমাজের কল্যাণসাধন করতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি প্রত্যেকেরই কিছু সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ও দায়িত্ব পালন করতে হয়।আর এই সমাজসেবা করার কথা হয়তো অনেকেই ভাবেন, কিন্তু সকলের পক্ষে তা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবে যদি কেউ ইচ্ছুক হন তবে তা প্রথমে নিজ গৃহ থেকেই শুরু করতে হবে, তখনই কেবল সামগ্রিকভাবে দেশ ও দশের কল্যাণ সাধন সম্ভব।মানুষের মাঝে ট্রানসেনডেন্স নিড না তৈরী না হলে এটি পুরোপুরি সম্ভব নয়।
মনোবিগ্ঞানী আব্রাহাম মাসলো এর মানুষের চাহিদার সম্প্রসারিত শ্রেণিবিন্যাসে স্ব-বাস্তবকরণ বা সেল্ফ একচুয়ালাইজেশন এর পরে যেটিকে স্থান দেয়া হয় , তা হলো ট্রানসেনডেন্স নিড অর্থাৎ নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ইচ্ছা বা নিজেকে অতিক্রম করে কিছু করার তাগিদ অনুভব করা।যেসব ব্যক্তিবর্গ তাদের অতীন্দ্রিয় চাহিদাগুলি পূরণ করতে চান তারা পরোপকারে এগিয়ে আসেন বা তাদের ব্যক্তিস্বার্থকে প্রভাবিত করে না এমন বিষয়গুলোর দ্বারা সম্পূর্ণরূপে চালিত হন, অনুপ্রাণিত হন।তারা তাদের নিম্ন স্তরের চাহিদাগুলি সন্তোষজনকভাবে পূরণ করার বিষয়ে এতটাই আত্মবিশ্বাসী থাকেন যে তখন তারা অন্যের প্রয়োজনের বিষয়ে চিন্তা করতে শুরু করেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চ্যারিটি বা দাতব্য সংস্থাকে সমাজে অনেক বড় অবদান রাখতে দেখা যায়; যার অধিকাংশই গড়ে উঠেছে মানুষের স্বেচ্ছায় দেয়া অর্থে মানবহিতৈষী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য। এসব দাতব্য সংস্থাকে সমাজে এমন অনেক বড় অবদান রাখতে দেখা যায় যেটা অনেক সময় সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগেও করা হয়ে ওঠেনা।আমাদের দেশে ব্যক্তি পর্যায়ে মানুষ দান করে, যাদের মাঝে ধর্মীয় অনুভূতি বেশি কাজ করে।বিশেষ উদ্দেশ্য না থাকলে এমন বৃহত্তর ও মহৎ পরিকল্পনা কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়।
একটি দাতব্য সংস্থা, সোসাইটি বা ফান্ড তৈরী করা হয়তো ততটা কঠিন নয়; কিন্তু নিয়ম মত এটাকে পরিচালনা করা এবং চালিয়ে যাওয়া সত্যিই কঠিন।অনেক সময় সেটা ব্যক্তি পর্যায়েই রয়ে যায়।কিন্তু তা যদি জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায় তবেই কেবল দুস্হদের জন্য এ সেবা পৌঁছে দেয়া সম্ভব দেশের যে কোন জায়গায়।আর এ ধরণের সংস্থাগুলো পরিচালনা করতে হবে বৈধ ভাবে, রাষ্ট্রের বিধিনিষেধ ও নীতিমালা অনুসরণ করে।
চট্টগ্রামে নরসিংদীর লোকদের এই সংগঠন ”নরসিংদী জেলা সমিতি, চট্টগ্রাম”
এমনই একটি সামাজিক সংগঠন যেটি পারস্পরিক ভাতৃত্ববোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ সবকিছু পালনের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সক্ষমতা এবং নানাবিধ মিথস্ক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
“দেশের মানচিত্র আজ অসহায়, নিরুপায় হয়ে স্থবির চিত্তে পাঠ করছে কেহ সমাজের বিধ্বংসী কবিতা”
বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সামাজিক দায়বদ্ধতা, সৃষ্টিশীলতা, স্বকিয়তা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ইত্যাদি তৈরিতে জেলা সমিতি গুলো অন্যতম ভূমিকা পালন করতে পারে। সুতরাং বৈষম্য বিহীন সমাজ গঠনে জেলা সমিতির অবদানকে হাইলাইট করা যেতে পারে।
সাইকিয়াট্রিষ্ট ডা. সাইফুন নাহার
সহযোগী অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান, এডিকশন সাইকিয়াট্রি ডিপার্টমেন্ট, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।